ডিজিটাল ক্যামেরাকে অনেক সময় ফিল্মলেস ক্যামেরা বলা হয়, কারন এতে কোনো ফিল্ম থাকেনা। ডিজিটাল ক্যামেরায় এক ধরনের অপটিক্যাল সেন্সর ব্যবহার করা হয় যা ছবির সাবজেক্ট থেকে আসা আলোকে সমানুপাতিক ইলেক্ট্রনিক চার্জে রূপান্তরিত করে।
বেশিরভাগ ডিজিটাল ক্যামেরায় ইমেজ সেন্সর হিসেবে CCD(Charge Couple Device) ব্যবহার করা হয়। কিছু কমদামী ক্যামেরায় ইমেজ সেন্সর হিসেবে CMOS(Complementary Metal Oxide Semiconductor) টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়। আসল কথা সেন্সরের কাজ হচ্ছে ছবির সাবজেক্ট থেকে আসা আলোকে ইলেক্ট্রনিক চার্জে পরিণত করা। এই কাজটি CCD ও CMOS সেন্সর ভিন্ন ভিন্নভাবে সম্পন্ন করে। এছাড়া CCD ও CMOS এর ম্যানুফ্যাকচারিং পদ্বতি ভিন্ন।
ইমেজ সেন্সর অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোক-সংবেদনশীল ডায়োড (ফটোসাইট) দিয়ে তৈরি। আলোক-সংবেদনশীল ডায়োডগুলো এর ওপর পতিত আলোর তীব্রতার সমানুপাতিক ইলেক্ট্রনিক চার্জ উৎপন্ন করে। আলো যত তীব্র হবে তত বেশি চার্জ তৈরি হবে এবং তীব্রতা কম হলে কম চার্জ তৈরি হবে। এর পরের ধাপ হচ্ছে যেটুকু চার্জ তৈরি হয়েছে তা read করে তার সমানুপাতিক বাইনারি ডাটা তৈরি করা। এই কাজটি করা হয় একটি Analog-to-Digital Converter (ADC) এর মাধ্যমে। CCD সেন্সরযুক্ত ডিজিটাল ক্যামেরায় সেন্সরের ইলেক্ট্রনিক চার্জ সরাসরি ADC-তে চলে যায়। অন্যদিকে CMOS সেন্সরযুক্ত ক্যামেরায় প্রতিটি ফটোসাইটে একটি করে Transistor থাকে যা ইলেক্ট্রনিক চার্জকে Amplify করে ADC-তে প্রেরণ করে। CCD তৈরি করা হয় বিশেষ ধরণের ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে এবং CCD সেন্সর খুবই উঁচুমানের ছবি তৈরি করতে সক্ষম। অন্যদিকে CMOS সেন্সর যে কোনো সাধারণ সিলিকন চিপ উৎপাদনকারী প্ল্যান্টে তৈরি করা সম্ভব। CMOS সেন্সর খুবই Noise sensitive এবং এর আলোকসংবেদনশীলতা কম। অনেক ফোটন (আলো) ফটোসাইটের ওপর না পড়ে Transistor এর ওপর পড়ে, ফলে আলোর তীব্রতা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। তবে CMOS সেন্সর খুবই কম দামি এবং অনেক কম পাওয়ার Consume করে। একটি CCD সেন্সর CMOS সেন্সরের চেয়ে প্রায় ১০০ গুন বেশি ব্যাটারি শোষণ করে। এছাড়া যেহেতু CMOS সেন্সর সাধারণ সিলিকন চিপ প্ল্যান্টে তৈরি করা সম্ভব তাই বিভিন্ন রেজুলেশনের CMOS সেন্সরযুক্ত ডিজিটাল ক্যামেরা বাজারে পাওয়া যায়। অন্যদিকে CCD সেন্সর বাণিজ্যিক কারণে 1.3 মেগাপিক্সেলের নিচে উৎপাদন করা হয় না। তবে CMOS সেন্সর ধীরে ধীরে কোয়ালিটির দিক দিয়ে CCD সেন্সরের সমতুল্য হচ্ছে এবং হাই কোয়ালিটির ডিজিটাল ক্যামেরা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে চলে আসছে।
ইমেজ সেন্সরে যে ফটোসাইটগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো সবই কালারব্লাইন্ড। অর্থাৎ এগুলো কেবল আলোর তীব্রতা (ফোটনের সংখ্যা) বুঝতে পারে কিন্তু আলোটি কী রঙের তা আলাদা করতে পারে না। অথচ একটি true কালার ইমেজে লক্ষ লক্ষ কালার থাকে। তবে যে কোনো কালারকেই তিনটি কালারের (Red, Green, Blue) সমন্বয়ে প্রকাশ করা যায় এবং ডিজিটাল ক্যামেরায় এই মূলনীতিটিই ব্যবহার করা হয়। সাবজেক্ট থেকে আসা আলো সেন্সরে পৌছানোর আগে একটি ফিল্টারের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। ফিল্টারের মধ্য দিয়ে তিনটি কম্পোনেন্ট (Red, Green, Blue) কালারের মধ্যে কেবল একটি কম্পোনেন্ট কালার যেতে পারে।
High quality-র ক্যামেরাতে তিনটি কম্পোনেন্ট কালারের জন্য তিনটি পৃথক সেন্সর ব্যবহার করা হয়, যেখানে প্রতিটি সেন্সরের উপর আলাদা ফিল্টার থাকে। সাবজেক্ট থেকে আসা আলো প্রথমে একটি Beam splitter এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। Beam splitter একই ছবিকে তিনটি সেন্সরেই প্রেরণ করে। যদিও প্রতিটি সেন্সরেই একই ছবি প্রেরিত হয় তথাপি একেকটি সেন্সর, ফিল্টারের কারণে কেবল একটি রঙের আলোর সমানুপাতিক ইলেক্ট্রনিক চার্জ তৈরি করে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি পিক্সেলের প্রতিটি কম্পোনেন্ট কালার ইনফরমেশন আলাদা আলাদাভাবে পাওয়া যায় বলে High quality-র ছবি পাওয়া যায়। তবে তিনটি সেন্সর, Beam splitter ইত্যাদি ব্যবহারের কারণে ক্যামেরার আকৃতি বেশ বড় হয় এবং দাম অত্যন্ত বেশি পড়ে যায়। তাই বেশির ভাগ ক্যামেরাতে একটি সেন্সর ব্যবহার করেই প্রতিটি পিক্সেলের কালার ইনফরমেশন নির্ণয় করা হয়। এক্ষেত্রে লাল, সবুজ, নীল ফিল্টারকে সেন্সরের সামনে খুব দ্রুত ঘুরানো হয় এবং সেন্সর একটির পর একটি তিনটি কালারের ইমেজ খুব দ্রুততার সাথে রেকর্ড করে। যেহেতু তিনটি রঙের তিনটি ইমেজ (যদিও তিনটি ইমেজের মধ্যে সময়ের পার্থক্য খুবই কম) সেন্সরে আসে তাই ক্যামেরা অথবা ছবির সাবজেক্ট যে কোনো একটি যদি নড়াচড়া করে তাহলে ঠিকমতো ছবি আসবে না। ছবি ঝাপসা আসবে। তাই এই পদ্ধতি খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। বর্তমানে বেশিরভাগ ক্যামেরাতে যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় তাতে সেন্সর প্রতিটি পিক্সেলের জন্য কেবল একটি কম্পোনেন্ট কালারের ইনফরমেশন রেকর্ড করে এবং ইমেজ প্রসেসিং এর বিভিন্ন এলগরিদম এর মাধ্যমে আশপাশের অন্যান্য পিক্সেলের কালার ইনফরমেশন ব্যবহার করে ঐ পিক্সেলের অন্য দুটি কালার ইনফরমেশন ক্যালকুলেশন করে বের করে। এই পদ্ধতিকে Interpolation বলা হয়। Interpolation পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ফিল্টার প্যাটার্ন হলো "বেয়ার ফিল্টার প্যাটার্ন"। ফিল্টারের প্যাটার্ন ঠিক করে দেয় কোন পিক্সেলে কোন কালারের ইনফরমেশন রেকর্ড করা হবে। বেয়ার প্যাটার্নে মোট পিক্সেলের অর্ধেক পিক্সেলে সবুজ এবং বাকি অর্ধেক পিক্সেলে লাল ও নীল রঙের ইনফরমেশন রেকর্ড করা হয়, কারণ মানুষের চোখ সবুজের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। যেহেতু Interpolation পদ্ধতিতে একটি সেন্সর ব্যবহৃত হয় তাই এই ধরনের ক্যামেরার দাম কম অ আকৃতিতেও ছোট।
প্রতিটি পিক্সেলের তিনটি কালার ইনফরমেশন পাওয়া হয়ে গেলে এ তিনটি কালার ইনফরমেশন যোগ করে প্রতিটি পিক্সেলের true কালার নির্ণয় করা হয়। এভাবে প্রতিটি পিক্সেলের true কালার নির্ণয় করে একটি সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায়। একটি মোটামোটি রেজ্যুলেশনের ছবির প্রতিটি পিক্সেলের true কালার পৃথক পৃথকভাবে রেকর্ড করলেও ছবিটি মেমোরিতে প্রচুর জায়গা নিবে। যেমন: একটি 1280x960 রেজ্যুলেশনের ছবিতে 1280x960=1228800টি পিক্সেল থাকে। প্রতিটি পিক্সেলের true কালার ইনফরমেশন রেকর্ড করতে যদি 16টি bit লাগে তাহলে ছবিটিকে Uncompressed অবস্থায় রেকর্ড করতে 1228800x16=19660800টি বিট বা 19660800/8=24576001বাইট(2.34375MB)মেমোরি লাগবে। তাই ছবিকে এভাবে Uncompressed অবস্থায় রেকর্ড না করে JPEG বা অন্যান্য Compressed format-এ রেকর্ড করা হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য ক্যামেরাতে একটি প্রসেসর থাকে। প্রসেসরকে অবশ্য অন্যান্য আরো কাজ করতে হয়।
যে ফটোসাইটগুলো ডিজিটাল ক্যামেরার সেন্সরে ব্যবহার করা হয় সেগুলো আলোর একটি নির্দিষ্ট মাত্রার Intensity(তীব্রতা) পযন্ত সঠিকভাবে মাপতে পারে। এই মাত্রার চেয়ে বেশি Intensity-র আলো পড়লে ফটোসাইটগুলো Saturated হয়ে যায়। Highest intensity-র আলো ফটোসাইটের ওপর পড়লে এটি যে পরিমাণ ইলেক্ট্রনিক চার্জ তৈরি করবে এর চেয়ে বেশি Intensity-র আলো পড়লেও এটি একই পরিমাণ চার্জ তৈরি করবে এবং এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারবে না। তাই ফটোসাইট যান Saturated না হয়ে যায় সেজন্য ক্যামেরায় Aperture এবং Shutter ব্যবহার করা হয়। Aperture অবস্থান করে Lens এর ঠিক পিছনে। Aperture এর মাধ্যমে নির্ধারিত হয় আলো কতটুকু জায়গার মধ্য দিয়ে সেন্সরে পৌছাবে। রৌদ্রউজ্জ্বল দিনে প্রচুর আলো থাকে বলে এরকম অবস্থায় ছবি তোলার সময় Aperture কম রাখা হয়। অন্যদিকে মেঘলা দিনে আলো কম থাকে বলে Aperture বেশি রাখা হয়। ফলে বেশি আলো সেন্সরে পৌছতে পারে। অনেকটা মানুষের চোখের পিউপিলের মতই Aperture কাজ করে। প্রচন্ড রোদে আমাদের চোখ কুঁচকে আসে আসলে পিউপিলকে সংকুচিত করার জন্য।
অন্যদিকে Shutter speed নির্ধারণ করে আলো কত সময় ধরে ক্যামেরায় প্রবেশ করবে। ফিল্ম বেস্ড ক্যামেরায় Mechanical Shutter ব্যবহার করা হয়। ডিজিটাল ক্যামেরায় Electronic shutter ব্যবহার করা হয়। কোনো কোনো ডিজিটাল ক্যামেরায় Mechanical ও Electronic shutter একত্রে যৌথভাবে shutter এর কাজ করে। ফটোগ্রাফির ভাষায় Aperture ও Shutter speed নির্ধারণ করাকে একত্রে Exposure control বলা হয়। ডিজিটাল ক্যামেরা অটোম্যাটিক Exposure control করতে পারে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ক্যামেরা একটি Sample ছবি তুলে (কিন্তু রেকর্ড করে না), তা থেকে intensity, focus প্রভৃতি ইনফরমেশন সংগ্রহ করে এবং সেই অনুযায়ী Exposure সেট করে। Exposure control করার ক্ষেত্রে প্রসেসর সাহায্য করে। এছাড়া কোনো কোনো হাই এন্ড ডিজিটাল ক্যামেরায় Manually Aperture ও shutter speed কন্ট্রোল করা যায় যা প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের জন্য খুব দরকারি।
No comments:
Post a Comment